শিশু সাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত সুজন বড়ুয়ার একান্ত সাক্ষাৎকার

0
12

বাংলাদেশের ইতিহাস ঐতিহ্য সংলগ্ন জাতীয় মূল চেতনার সঙ্গে শিশু-কিশোর মনের আকুলতা, উদ্দামতা, রহস্যময়তা, অভিযানপ্রিয়তার মেলŸন্ধনই তার রচনার কেন্দ্রীয় বিষয়। কিশোর কবিতাচর্চায় তিনি যুক্ত করেছেন নতুন মাত্রা। বাংলাদেশের বর্তমান কিশোর কবিতা আন্দোলনের অন্যতম অগ্রসেনানী তিনি। শিশু-কিশোর ভোগ্য কবিতাও যে বয়স্ক পাঠকদের কাছে উপভোগ্য হয়ে উঠতে পারে সুজন বড়–য়ার কবিতা তার উজ্জ্বল উদাহরণ। ছোটদের জন্য রচিত তার গল্প উপন্যাসগুলো চমকপ্রদ ঘটনা বিন্যাসে মনোমুগ্ধকর ও গভীর আবেদনময়।


সাক্ষাৎকার গ্রহণ : শ্যামল চৌধুরী, সম্পাদক, অমিতাভ

শিশু-কিশোরদের চোখে অপার স্বপ্নের বীজ বুনে দেওয়ার ব্রত নিয়ে বাংলাদেশে যারা শিশুসাহিত্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করেছেন তাদের মধ্যে সুজন বড়ুয়া অন্যতম। তিনি ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমীর প্রকাশনা বিভাগে যোগদান করেন। বর্তমানে বিভাগীয় প্রধান। তিনি মনে করেন বই-পত্র ও লেখকদের সঙ্গে থাকতে অত্যন্ত ভালো লাগার কারণেই দ্বিতীয় কোনো চাকরির চেষ্টা করেননি। গত শতকের সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে নিরলসভাবে লিখে চলেছেন তিনি। ছড়া, কিশোর কবিতা, কিশোর উপন্যাস, গল্প, জীবনী, প্রবন্ধ, নাটক ইত্যাদি শাখায় তিনি দুরন্ত রঙিন কৈশোরকে চিত্রণ করেছেন অত্যন্ত সার্থকতার সঙ্গে। বাংলাদেশের ইতিহাস ঐতিহ্য সংলগ্ন জাতীয় মূল চেতনার সঙ্গে শিশু-কিশোর মনের আকুলতা, উদ্দামতা, রহস্যময়তা, অভিযানপ্রিয়তার মেলŸন্ধনই তার রচনার কেন্দ্রীয় বিষয়। কিশোর কবিতাচর্চায় তিনি যুক্ত করেছেন নতুন মাত্রা। বাংলাদেশের বর্তমান কিশোর কবিতা আন্দোলনের অন্যতম অগ্রসেনানী তিনি। শিশু-কিশোর ভোগ্য কবিতাও যে বয়স্ক পাঠকদের কাছে উপভোগ্য হয়ে উঠতে পারে সুজন বডড়ুয়ার কবিতা তার উজ্জ্বল উদাহরণ। ছোটদের জন্য রচিত তার গল্প উপন্যাসগুলো চমকপ্রদ ঘটনা বিন্যাসে মনোমুগ্ধকর ও গভীর আবেদনময়। চিন্তার অভিনবত্ব ও অনুপম ভাষা বিন্যাস তাঁর গদ্য রচনার প্রাণ। আমাদের শিশুসাহিত্যের এক বিরল ব্যতিক্রমী কণ্ঠস্বর সুজন বড়ুয়া। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির সন্তান সুজন বড়ুয়া আজ সাফল্যের শিখরে।  শিশু সাহিত্যে বাংলা একাডেমী পুরস্কারপ্রাপ্ত সুজন বড়ুয়ার মুখোমুখিতে উঠে এসেছে তাঁর আবেগ-অনুভূতির কথা।


অমিতাভ : একজন শিশুসাহিত্যিক হিসেবে আপনার এ স্বীকৃতির অনুভূতিটা জানতে চাই।

সুজন বড়ুয়া : অনুভূতি অবশ্যই আনন্দের। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার সারা জীবনের সাধনার স্বীকৃতি এবং এটি বাংলাদেশে সাহিত্যচর্চার সর্বোচ্চ স্বীকৃতি। আমি এ পুরস্কারকে বলতে চাই বাংলাদেশের নোবেল পুরস্কার। এক জীবন সাধনা করে কারো কারো ভাগ্যে এ প্রাপ্তি ঘটে। বাংলাদেশে অনেক লেখক-কবি আছেন, যাঁরা এ পুরস্কার পাননি। সে দিক থেকে আমি সৌভাগ্যবান। এ পুরস্কার পাওয়ায় আমি আনন্দিত ও গৌরবান্বিত।


অমিতাভ : একজন লেখকের সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার ব্যাপারটিকে আপনি কিভাবে দেখেন? আপনি কতটুকু দায়বদ্ধ?সুজন বড়ুয়া : লেখকের সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতাকে আমি অবশ্যই ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখি। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা লেখকের থাকতেই হবে। যে লেখক সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ নন, তার লেখা বেশি দিন কেউ পড়বে না। তার ব্যাপক পাঠকগোষ্ঠী গড়ে উঠবে না। আমি সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ কিনা তা আমার ব্যাপক পাঠকগোষ্ঠীই বলে দেয়। প্রথম বই থেকেই আমি পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছি। আমার প্রথম পদ্য ও গদ্য দুটো বইয়ের জন্যই আমি অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার লাভ করি। আমার লেখার মধ্যে সারবস্তু কিছু না থাকলে নিশ্চয়ই এরকম বিরল ঘটনা ঘটত না। আমি শুধু আনন্দদান বা সৌন্দর্য সৃষ্টির জন্য কিছু লিখি না। আনন্দ ও সৌন্দর্যের সঙ্গে আমি সব সময় পাঠককে আরো বাড়তি কিছু দিতে চাই। সেটা হতে পারে আমার আবেগ, স্বপ্ন, আদর্শ, নীতি, শুভ, শিক্ষণীয় কল্যাণ বোধ। আমি মনে করি এসব ইতিবাচকতা ছাড়া সাহিত্য কখনো পাঠককে ছুঁয়ে যেতে পারে না। যে সাহিত্যে পাঠককে ছুঁয়ে যাওয়ার উপাদান থাকে না সেটা চর্চার প্রয়োজন কী?

অমিতাভ : নবীন লেখকদের প্রতি আপনার নির্দেশনা এবং প্রত্যাশা কি?নির্দেশনা তেমন কিছু নেই। নবীন লেখককে তার সময় সমাজ ও সাহিত্য জগৎ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। নিরন্তর পাঠ গ্রহণ করতে হবে। তাদের কাছে আমার প্রত্যাশা নিজস্ব ভঙ্গিতে মৌলিক কিছু সৃষ্টি করতে হবে।

সুজন বড়ুয়া : বর্তমানে শিশুসাহিত্য চর্চা এবং বিশেষ করে চট্টগ্রামে শিশুসাহিত্য চর্চার মূল্যায়ন?বর্তমানে শিশুসাহিত্য চর্চা বেশ বেগবান বলে আমি মনে করি। গদ্য পদ্য সব শাখায় আশাব্যঞ্জক কাজ হচ্ছে। চট্টগ্রামে গদ্যের চেয়ে পদ্য চর্চা বেশি। নানামুখী গদ্যসাহিত্যের চর্চা বাড়াতে হবে। তারপরও আমি বলব বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিশুসাহিত্য চর্চায় চট্টগ্রাম অনেক এগিয়ে। চিন্তায়, প্রকাশনায় ও সাংগঠনিক তৎপরতায় চট্টগ্রামের চর্চা ঢাকাকেও প্রভাবিত করে।


অমিতাভ : বর্তমানে যে শিক্ষা ব্যবস্থা তা শিশুদের জন্য সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে কতটুকু সাহিত্যবান্ধব?

সুজন বড়ুয়া : বর্তমান-অতীত বলে কথা নেই। সাহিত্য চর্চার কথা বিবেচনায় রেখে কখনো শিক্ষা ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হয়নি, হয় না। সাহিত্য চর্চা হল ভেতরের ব্যাপার। ভেতর থেকে কেউ উদ্দীপিত হলে সাহিত্য বেরিয়ে আসে। সেখানে শিক্ষা ব্যবস্থার করণীয় তেমন থাকে না। সামান্যই উৎসাহিত করতে পারে। যেহেতু আমাদের আলোচ্য বাংলা সাহিত্য চর্চা, সে ক্ষেত্রে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক শ্রেণির বাংলা পাঠ্য বইগুলোতে প্রতিষ্ঠিত তরুণ লেখকদের লেখা অন্তর্ভুক্ত করে অনুপ্রাণিত করা যেতে পারে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীরা যাতে সৃজনশীল সাহিত্য বাধ্যতামূলকভাবে বেশি পড়ে সে রকম কার্যক্রম-প্রতিযোগিতা ইত্যাদি গ্রহণ করতে পারে। এতে সাহিত্য চর্চায় কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এসব ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা বা জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের কার্যক্রম নেই বললেই চলে।  


অমিতাভ : শিশুদের সাহিত্যমনস্কতা এবং বিজ্ঞানমনস্কতা এ দু’টি দিককে কিভাবে সমন্বয় করা যায়? 

সুজন বড়ুয়া : শিশুদের সাহিত্যমনস্কতা এবং বিজ্ঞানমনস্কতার সমন্বয়ের জন্য লেখক, অভিভাবক ও শিক্ষকের সচেতনতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। লেখকরা সৃজনশীল সাহিত্য ও বিজ্ঞানমনস্ক রচনা অধিক হারে লিখবেন, অভিভাবক ও শিক্ষকরা সে ধরনের রচনা পাঠে শিশুদের উদ্বুদ্ধ করবেন, তাহলেই সুফল পাওয়া যাবে।

অমিতাভ : শিশুদের চেতনাকে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে তোলা এবং তাদের মাঝে নৈতিক মূল্যবোধ বিকাশের ক্ষেত্রে শিশুসাহিত্যিকদের সমন্বিত প্রয়াস কী হতে পারে?

সুজন বড়ুয়া : মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শিশুদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও অভিভাবক ও শিক্ষকের ভূমিকাই বড় বলে আমি মনে করি। শিশুদের হাতে এ ধরনের বই পুস্তক বেছে বেছে তুলে দিতে হবে। দায়িত্বশীল সত্যিকারের শিশুসাহিত্যিকরা দেশপ্রেমমূলক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন লেখাই লিখে থাকেন। যারা এ ব্যাপারে অসচেতন ও বিমুখ তাদের লেখা শিশুসাহিত্য হিসেবে বিবেচিত হবে না। সত্যিকারের শিশুসাহিত্যে ‘শিশু’ এবং ‘সাহিত্য’ দুটোই থাকতে হবে। সাহিত্য শুধু আনন্দ বিনোদন নয়, সাহিত্যে শিক্ষণীয় কিছু না থাকলে, বাণী না থাকলে সে সাহিত্য কখনো স্থায়ী হয় না। 

অমিতাভ : সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে বর্তমান প্রজন্মের যে উদাসীনতা তার মৌলিক কারণ এবং এর থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কি? 

সুজন বড়ুয়া : বর্তমান প্রজন্ম সাহিত্য চর্চায় উদাসীন বলে আমি মনে করি না। বিজ্ঞান প্রযুক্তির অগ্রগতির কল্যাণে তারা হয়তো ফেসবুক চর্চায় বেশি আগ্রহী। ফেসবুকে ছন্দ-কবিতা স্ট্যাটাস দিতে পারলেই মনে করে সাহিত্য চর্চা হয়ে গেল। বুঝতে হবে প্রকৃত সাহিত্য চর্চা ওটা নয়। মূলধারার সাহিত্য চর্চা কিন্তু প্রিন্ট মিডিয়ায়, পত্র-পত্রিকায়।


অমিতাভ : এ পর্যন্ত প্রকাশিত বই এর সংখ্যা ও এ বছরের বই মেলায়  প্রকাশিত বই কতটি?

সুজন বড়ুয়া : এ পর্যন্ত আমার ৮০টির মতো বই প্রকাশিত হয়েছে। এবারের একুশে বইমেলায় সুজন বড়ুয়ার লেখা চারটি বই প্রকাশ হয়েছে। আদিগন্ত প্রকাশন  থেকে এসেছে ‘বড় রাজ কুমার’, ‘জোসনা ও জোনাকি’ কথাপ্রকাশ থেকে এসেছে ‘লেখক হবো কেমন করে’, ‘ছন্দের সহজপাঠ’।    

অমিতাভ : চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠা, শৈশব সম্পর্কে কিছু বলুন।

সুজন বড়ুয়া : আমার ১৮ বছর কেটেছে গ্রামে। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার ছিলোনিয়া গ্রামে আমার জন্ম। সমতল ভূমি, টিলা, নদী গাছপালা ঘেরা অনন্য ছায়াসুনিবিড় এক গ্রাম। এর সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে আমার শৈশব কৈশোর। আমি  মনে করি আমার ব্যতিক্রমী শৈশব-কৈশোরই আমার লেখালেখির অনন্ত প্রেরণার উৎস।  
অমিতাভ : ব্যক্তি জীবন ও পারিবারিক অবস্থান?

সুজন বড়ুয়া : ছয় ভাইবোনের মধ্যে আমি তৃতীয়। চার ভাইয়ের সবাই কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত। দুই বোন বিবাহিত। আমার স্ত্রী শর্মিষ্ঠা বড়ুয়া চৌধুরী সরকারি চাকরিজীবী। আমাদের দুই কন্যা। বড় মেয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তৃতীয় বর্ষে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্রী। ছোট মেয়ে এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী। 
অমিতাভ : চট্টগ্রামের বইমেলা সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কি? 

সুজন বড়ুয়া : চট্টগ্রামের বইমেলা সব সময়ই প্রাণের মেলায় পরিণত হয়। লেখক, প্রকাশক, পাঠক সবারই আন্তরিকতার স্পর্শ পাই। আমার ভালো লাগে।
ধন্যবাদ অমিতাভ সম্পাদনা পরিষদের সবাইকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here