জুসি বড়ুয়া অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন বুদ্ধ কীর্তন এর জন্য। আজ যে সকল প্রজন্মরা বিভিন্ন ব্যান্ড সংগীত শুনতে অভ্যস্ত সে জায়গায় তারা বুদ্ধ কীর্তন শুনতে চায় সেটা অত্যন্ত সৌভাগ্যের বলে মনে করেন তিনি। তাঁর ভাষায়- কিছু একটা হয়তো করতে পেরেছেন এবং বুদ্ধ কীর্তনের নব জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে।
শিশির বড়ুয়া:
প্রতিভাময়ী কণ্ঠশিল্পী জুসি বড়ুয়া। বোয়ালখালী উপজেলার কধুরখীল গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা সঞ্জীব চন্দ্র বড়ুয়া ও মাতা দিপু বড়ুয়ার সন্তান তিনি। নিজ গ্রামে শৈশব কাটে তাঁর। ২০০৬ সালে গ্রাজ্যুয়েশন শেষ করেছেন।
মাত্র ৯ বছর বয়সে গানের তালিম নেওয়া শুরু করেন তিনি। গানের প্রথম হাতেখড়ি মিঠু চৌধুরীর কাছে, এরপর প্রায় ৪ বছর ওস্তাদ মিহির লালার কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালিম নেন। ছোটবেলা থেকেই মঞ্চে গান গাওয়ার প্রবল ঝোঁক ছিল। নবম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় মঞ্চে গান গাওয়া শুরু, গ্রামের যারা গান-বাজনায় জড়িত ছিল তাদের সাথে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে দু’একটি গাইতে গাইতে মঞ্চে নিয়মিত হন এবং খ্যাতি অর্জন করেন।
শিল্পী জুসি বড়ুয়ার মুখ থেকেই শোনা, ২০০১ সালে শহরের বড় বড় মিউজিশিয়ানদের সাথে মঞ্চে গান গাওয়া হয়। সেই থেকে চট্টগ্রাম সহ ফেনী, ঢাকা, কক্সবাজার এভাবে বিভিন্ন জায়গায় গান গাওয়া হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা, বিভিন্ন জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠানে গান গাওয়া, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের এর বিজয় মঞ্চে গান গাওয়া, এভাবে চলতে থাকে।
অপরদিকে জুসি বড়ুয়াকে গ্রামের কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হতো, বিশেষ করে অনেক শিল্পীর মাঝে সবসময় দর্শকদের চাওয়া থাকতো প্রথমে ধর্মীয় গান দিয়ে শুরু করতে হবে, তাই তাঁর ধর্মীয় গান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হতো। এভাবে অনেক কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠানে ধর্মীয় গান গাইতে গাইতে তিনি বৌদ্ধ ধর্মীয় গান শেখার প্রতি মনোনিবেশ করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অনুষ্ঠানে যখন মাত্র ২/৩ টি গান গাইতাম, এতেই সবাই খুশি হতো। এতে করে আমার উৎসাহ আরো বেড়ে যায় এবং আমার গানের পরিধি বাড়তে থাকে। পরবর্তীতে কোন কোন অনুষ্ঠানে ৫/৬টি ধর্মীয় গানও গাইতাম।’
এভাবে জুসি বড়ুয়ার ধর্মীয় চিন্তা-চেতনা ক্রমশ বাড়তে থাকে। এক সময় বিভিন্ন গ্রামের কীর্তনীয়ারা প্রশংসা করে ধর্মীয় গান তথা কীর্তন চর্চার প্রতি উৎসাহিত করেন। অতঃপর চেষ্টা চালালেন বুদ্ধ কীর্তন সংগ্রহ করার জন্য। আক্ষেপের সাথে জানালেন, এ কাজে তিনি বিভিন্ন জনের দ্বারে দ্বারে গিয়েছেন। অনেকে সহযোগিতা করলেও কেউ-বা নানা অজুহাতে ফিরিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু তাতে দমে না গিয়ে কীর্তন সংগ্রহ ও গাওয়ার প্রতি প্রবল আগ্রহে আজ অনেক কীর্তন তিনি সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছেন।
জুসি বড়ুয়া বলেন, “রাউজানের হোয়ারাপাড়াস্থ নিবাসী আমার গুরু ভাই নয়ন বড়ুয়া আমাকে আসর বন্দনা থেকে শুরু করে ‘বুদ্ধ সন্ন্যাস’ কীর্তনটি প্রদান করেন। ২০২০ সালে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ এর কারণে লকডাউন ছিলো, তখন আমি অমাবস্যা, অষ্টমী ও পূর্ণিমা তিথিতে ফেসবুক লাইভে বুদ্ধ কীর্তন পরিবেশন করেছি। সবাই খুব বাহবা দিলেন, বিভিন্ন মন্তব্য করেন। এতে আমার আগ্রহ দিনদিন বাড়তে থাকে। একসময় আমার নিজস্ব একটি ফ্যান পেজ ওপেন করি, সেই পেজ থেকে লাইভে কীর্তন পরিবেশন করি। লকডাউন যখন শিথিল হয় তখন আমার পেজে বিভিন্ন জায়গা থেকে কীর্তন গাওয়ার আমন্ত্রণ আসতে থাকে। এভাবেই শুরু হয়ে গেলো কীর্তনের জার্নি।”
জুসি বড়ুয়া অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন বুদ্ধ কীর্তন এর জন্য। আজ যে সকল প্রজন্মরা বিভিন্ন ব্যান্ড সংগীত শুনতে অভ্যস্ত সে জায়গায় তারা বুদ্ধ কীর্তন শুনতে চায় সেটা অত্যন্ত সৌভাগ্যের বলে মনে করেন তিনি। তাঁর ভাষায়- কিছু একটা হয়তো করতে পেরেছেন এবং বুদ্ধ কীর্তনের নব জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। জুসি বড়ুয়া বলেন, ‘বর্তমান কীর্তনের জোয়ার ধরে রাখতে আমি অক্লান্ত পরিশ্রম করছি এবং অনলাইনের মাধ্যমে নিয়মিত পালি ভাষা শিখছি যাতে শুদ্ধ উচ্চারণে বুদ্ধ বচন শিখতে পারি।’
নিজের ইউটিউব চ্যানেলে ২০১৮ সালে সীবলী ব্রতকথা নামে একটি অডিও গাথা রিলিজ করেন তিনি, যার ভিউয়ার এখন ৪ লাখ ছাড়িয়েছে। এছাড়াও আষাঢ়ী পূর্ণিমা গাথা, বৈশাখী পূর্ণিমা গাথা, পারমার্থিক জীবন চর্যা গাথাগুলোর অডিও ভার্সন রিলিজ হয়। ২০২১ সালের ২৬ জানুয়ারি ভিডিগ্রাফিতে রিলিজ হয় ‘ভুবন মঙ্গল বুদ্ধের নাম’ কীর্তনটি।
শিল্পী জুসি বড়ুয়ার ভাষায়- তিনি চাইলে মৌলিক গান গাইতে পারতেন, কিন্তু তিনি চান পুরনো গানগুলোকে আবার নতুনত্বের রূপে সবার মাঝে উপস্থাপন করার। অবশ্য মৌলিক গানের আগে তিনি হারিয়ে যাওয়া বুদ্ধ কীর্তনগুলো নিয়ে কাজ করে যেতে চান এবং মৌলিক বুদ্ধ কীর্তনের কাজও তিনি শীঘ্রই শুরু করবেন।
যখন থেকে বুদ্ধ কীর্তন গাওয়া শুরু হয়, তখন থেকে অন্য গান গাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন তিনি। এখন শুধু বুদ্ধ কীর্তন নিয়েই কাজ করে যেতে চান। তাঁর স্বপ্ন, ভবিষ্যতে বুদ্ধ কীর্তন কেউ ছেড়ে দিলেও তিনি ছাড়বেন না। যতদিত সুস্থ থাকবেন, বেঁচে থাকবেন, মনে প্রাণে বুদ্ধ কীর্তনকে ধারণ করে যেতে চান শিল্পী জুসি বড়ুয়া।