কালের বিবর্তনে নানা ঐতিহাসিক কারণে বৌদ্ধধর্ম ভারতের দক্ষিণ-পূর্ব কোনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। ভারতের এই দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এখন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অন্তর্ভূক্ত। অনুমান করা হয় সম্রাট অশোকের পূর্ববর্তীকালে বৌদ্ধধর্ম উত্তরবঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সংস্কৃত বিনয়পিটকে উপসম্পাদনা বিষয়ক অধ্যায়ে পূণ্ডবর্ধনের উল্লেখ পাওয়া যায়। পূণ্ডবর্ধন উত্তরবঙ্গের একটি প্রসিদ্ধ জনপদ।
জামাল উদ্দিন:
একথা কারও অজানা নেই যে, বৌদ্ধধর্ম একসময় ভারত উপমহাদেশে প্রচণ্ড প্রতিপত্তির অধিকারী ছিল। ভারতের বিভিন্ন স্থানে প্রাপ্ত শিলালিপি ও প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ তার সভ্যতা প্রমাণ করে। সাঁচী স্তুপ, সারানাথ, কুশিনারা, সোমপুর ও শালবন প্রভৃতি এলাকায় প্রতœতাত্ত্বিক নির্দশন অতীতের বৌদ্ধধর্ম ও বৌদ্ধগৃহী সমাজের অবস্থান এবং তাদের ধর্মীয় আচার আচরণের পরিচয় দেয়। সম্রাট অশোক, কনিঙ্ক ও হর্যবর্ধনের প্রচেষ্টায় ভারত-উপমহাদেশে বৌদ্ধ ধর্মের অভাবিত উন্নতি ঘটে। কালের বিবর্তনে নানা ঐতিহাসিক কারণে বৌদ্ধধর্ম ভারতের দক্ষিণ-পূর্ব কোনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। ভারতের এই দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এখন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অন্তর্ভূক্ত।
অনুমান করা হয় সম্রাট অশোকের পূর্ববর্তীকালে বৌদ্ধধর্ম উত্তরবঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সংস্কৃত বিনয়পিটকে উপসম্পাদনা বিষয়ক অধ্যায়ে পূণ্ডবর্ধনের উল্লেখ পাওয়া যায়। পূণ্ডবর্ধন উত্তরবঙ্গের একটি প্রসিদ্ধ জনপদ। সাঁচীতে প্রাপ্ত দুজন পূণ্ডবর্ধনবাসী কর্তৃক প্রদত্ত দু’খানি লিলালিপিতে উৎকীর্ণ লিপি দৃষ্টে খৃস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে উত্তরবঙ্গে বৌদ্ধধর্মের অস্থিত্ব সম্বন্ধে ধারণা করা যায়। মহাস্থানগড় ও নাগরযোনীকোণ্ডা লিলালিপিতে একথার সমর্থন পাওয়া যায়। খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতাব্দী থেকে সপ্তম শতাব্দীর ভেতর বহু চীনা প্ররিব্রাজক বৌদ্ধধর্ম শাস্ত্রে অধ্যায়ন করার জন্য ভারত উপমহাদেশে এসেছিলেন। তাদের মধ্যে ফাহিয়েন, হিউয়েন সাঙ ও ইৎসিঙের নাম উল্লেখযোগ্য।
ফাহিয়েন পঞ্চম শতাব্দীতে তাম্রলিপ্তিতে (বর্তমান মেদিনিপুর) দু বছর অবস্থান করে ‘সূত্র গ্রন্থের প্রতিলিপি প্রণয়ন ও বুদ্ধমূর্তির নকশা অঙ্কন করেছেন।” এই সময় তিনি উক্ত স্থানে ২২টি বৌদ্ধবিহার দেখেছেন বলে তাঁর বিবরণে উল্লেখ করেছেন। এতে প্রমাণিত হয় খ্রিস্টীয় ষষ্ট শতাব্দীতে বাংলার দক্ষিণাঞ্চলেও বৌদ্ধধর্ম প্রতিষ্ঠিত ছিল। হিউয়েন সাঙ নামে আরেকজন চীনা পরিব্রাজক সপ্তম শতাব্দীতে তাঁর বিবরণীতে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি বাংলাদেশে এসে স্বচক্ষে প্রধান প্রধান বৌদ্ধ কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করেছেন এবং এ সময় তিনি পূণ্ডবর্ধনে ২০টি বৌদ্ধ বিহার ও ৩ হাজার বৌদ্ধভিক্ষু দেখেছেন। ভিক্ষুগণ হীনযান ও মহাজান মতালম্বী ছিলেন। এই সময় বাংলায় কয়েকটি বৌদ্ধ রাজবংশ যথা খড়গ বংশ, পালবংশ, চন্দ্রবংশ ও পট্টিকেরা রাজবংশের অস্থিত্ব ছিল। উক্ত রাজবংশগুলোর মধ্যে পালবংশ হল সবচেয়ে প্রধান।
পাল রাজাগণ প্রায় ৪ শত বছর বাংলাদেশ শাসন করেন। পালযুগকে ‘বৌদ্ধধর্মের সুবর্ণ যুগ’ বলে অভিহিত করা হয়। পাল রাজারা মহাযান বৌদ্ধধর্মের অনুসারী ছিলেন, তাঁদের প্রত্যেক সরকারি কার্যবিবরণীর প্রারম্ভে ভগবান বৌদ্ধের উদ্দেশ্যে লিখিত প্রার্থণাসূচক বাণী দেখা যায়। পালরাজারা বৌদ্ধ বিহার নির্মাণ ও সংস্কার করার জন্য অকাতরে অর্থ ব্যয় ও ভূমিদান করেছেন। পালযুগ ছিল হীনযান (থেরবাদ) বৌদ্ধধর্মের পতনের যুগ এবং মহাযান বৌদ্ধ ধর্ম বিকাশের সময়। কালক্রমে মহাযান বৌদ্ধধর্ম মূল বৌদ্ধধর্মের আমুল পরিবর্তন আনয়ন করে।
মহাযানী শূন্যবাদ, বিজ্ঞানবাদ প্রভৃতি জটিল বৌদ্ধ দার্শনিক তত্ত্ব সাধারণ মানুষের নিকট বোধগম্য হত না। তাই তন্ত্রযানের সহজ সরল ক্রিয়াকলাপের দিকে মানুষের মন আকৃষ্ট হল। অসংখ্য দেব দেবীর কল্পনা, তাদের পুজা, মণ্ডল আঁকা, স্ত্যেত্র, তন্ত্র-মন্ত্র, মুদ্রা-ধারনী এসব ক্রিয়াকলাপ প্রাধান্য লাভ করে। ক্রমে কেেম মহাযান শাখা থেকে একটি বিকৃত বৌদ্ধধর্ম যা ‘তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম’ নামে পরিচিত বিকশিত হয়ে উঠে। আবার তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্ম থেকে কালচক্রযান, বজ্রযান ও সহজযান শাখার সৃষ্টি হয়। পুনরায় এই শাখাগুলো হতে মন্ত্রযান ও তন্ত্রযান শাখার সুষ্টি হয়। সোমপুরি, বাসুবিহার, জগদ্দল, নালান্দা ও পণ্ডিতবিহারে তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্মের চর্চা হত। অনেক তান্ত্রীক সিদ্ধাচার্য এই বিহারগুলোতে বসবাস করতেন। বগুড়া ময়নামতি ও পাহাড়পুড়ের প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। অনেক সিদ্ধাচার্য ছিলেন বাঙালি, তাঁদের মধ্যে জ্ঞানশ্রী, অভয়করগুপ্ত, কুমারগুপ্ত, প্রজ্ঞাভদ্র, কুক্কুরীপাদ এর নাম উল্লেখযোগ্য।
খ্রিস্টীয় নবম শতাব্দীতে চট্টগ্রামে পণ্ডিতবিহার নামে একটি প্রসিদ্ধ বৌদ্ধ ধর্মশাস্ত্র শিক্ষার কেন্দ্র ছিল। এই শিক্ষা নিকেতনের এতই খ্যাতি ছিল যে, দেশ-বিদেশের বহৃু শিক্ষার্থী এখানে সমবেত হয়েছিলেন। রাজা মহীপালের রাজত্বকালে (৯৮৮-১০৩৩) আচার্য প্রজ্ঞাভদ্র এই বিহারের অধ্যক্ষ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি তিলোপা বা তিলপাদ নামে পরিচিত। তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম প্রচারের জন্যে তিনি বিকৃত সংস্কৃত ভাষায় কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। প্রজ্ঞাভদ্রের শিষ্য ছিলেন নাড়পাদ নামক একজন সিদ্ধাচার্য।
কথিত আছে যে, বলিরত্ন নামক এক বৌদ্ধ আচার্য তান্ত্রিক ধর্মপ্রচারের জন্য চট্টগ্রাম থেকে তিব্বতে গিয়েছিলেন। বস্তুত অষ্টম শতক থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে পূর্ববঙ্গে যে সমস্ত বিহারের অস্থিত্ব ছিল সবকটিতে তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্মের চর্চা হত। সোমপুর, দেবকোট, বাসুবিহার ও আনন্দবিহার ছিল তান্ত্রিক সিদ্ধাচার্যের পঠন-পাঠনের প্রধান কেন্দ্র।