বৃষ্টি পড়ে টাপুুর টুপুর

0
20

বর্ষা প্রকৃতির এমন এক ঋতু, যে নিজে ভাবুক এবং মানুষের ভাবনা জগতেও কড়া নাড়ে। আর তাই বর্ষার শ্রাবণঘন দিনের কথা কবি-সাহিত্যিকরা তুলে ধরেন সুনিপুণ হাতে। 

শ্যামল চৌধুরী

ঐ আসে ঐ অতি ভৈরব হরষে

জলসিঞ্চিত ক্ষিতি সৌরভ রভষে

ঘনগৌরবে নবযৌবনা বরষা।ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। বাংলা বর্ষপঞ্জীর আষাঢ় ও শ্রাবণ দুমাস বর্ষাকাল। ঋতু পরিক্রমায় আবারও রূপসী বাংলায় বর্ষাঋতুর আগমন ঘটেছে।
বর্ষা প্রকৃতির এমন এক ঋতু, যে নিজে ভাবুক এবং মানুষের ভাবনা জগতেও কড়া নাড়ে। আর তাই বর্ষার শ্রাবণঘন দিনের কথা কবি-সাহিত্যিকরা তুলে ধরেন সুনিপুণ হাতে।
বর্ষার স্নিগ্ধ, সতেজ ও মায়াবি প্রকৃতি চারপাশে এক নির্মল মায়াজাল ছড়িয়ে রাখে। বৃষ্টির দিনে কবি নজরুলের উপলব্ধি-

রিমি রিমঝিম রিমঝিম নামিল দেয়া-

দেখি শিহরে কদম, বিদরে কেয়া-বর্ষার বর্ষণসিক্ত চারিত্রিক ঐশ্বর্যের সাথে কদম কেয়া আর কেতকীর পরম নৈকট্যের বন্ধন মানবীয় ভাবাবেগের মতই প্রবল। ভাবাবেগের এই প্রাবল্য তাড়িত হয়েই কাজী নজরুলের মত রবীন্দ্রনাথও গেয়ে ওঠেন : বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান। দ্ইু মহাকবির মত অনুভূতিশীল বাঙালির হৃদয়েও রিনিঝিনি সুরে বেজে উঠেঃ

অঝোর ধারায় ঝরবে বারি

ফুটবে কদম সারি সারি।বর্ষায় ময়ূরের পেখম মেলে নৃত্য আর কদমফুলের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য বড় অনুষঙ্গ হয়ে আছে বাংলার ধরিত্রীতে। বেখেয়ালী প্রকৃতি তার নীল চোখ দিয়ে যখন তখন অশ্রুসিক্ত করে বাংলার মাঠ-ঘাট, পথ-প্রান্তর। বৃষ্টির শব্দে যক্ষের মতোই বাঙালির হৃদয় অজানা বিরহে ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। বাঙালি কবিদের প্রিয় ঋতু বর্ষা। প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ বর্ষাকে বলেছেন, ধ্যানমগ্ন বাউল-সুখের বাঁশি। বাঙালির অন্যরকম প্রিয় এই ঋতুর আগমনে প্রকৃতি তার রূপ বদলে ফেলে। সবুজ বৃক্ষরাজি, তরুলতা সবকিছুই যেন গ্রীষ্মের তাপদাহ থেকে পরিতৃপ্তি নিতে স্নান করে ওঠে।
কাব্যভাণ্ডারের বহু ছত্রে কেবল বর্ষা আবাহনের পংক্তিঃ হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে, ময়ূরের মত নাচেরে। আকুল পরাণ আকাশে চাহিয়া উল্লাসে কারে যাচে রে। মহাকবি কালিদাস তার মেঘদূত কাব্যে আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে বিরোহী যক্ষ মেঘকে দূত করে সুদূর দুর্গম কৈলাশ শিখরে পাঠিয়েছিলেন বিরোহিনী প্রিয়ার কাছে। তিনি এই আষাঢ়েই মেঘদূত রচনা করেন।
রবীন্দ্রনাথ কালিদাসের উদ্দেশে লিখেছিলেন: কবিবর কবে কোন আষাঢ়ের পুণ্য দিবসে লিখেছিলে মেঘদূত। আবার রবীন্দ্রনাথ তাঁর নব বর্ষা প্রবন্ধে লিখেছেন- কর্মপাশ বদ্ধ প্রিয়তম যে আসিতে পারে না, পথিক বধূ তখন এ কথা আর মানিতে চাহে না। সংসারের কঠিন নিয়ম সে জানে, কিন্তু জ্ঞানে জানে মাত্র। সে নিয়ম যে এখনও বলবান আছে নিবিড় বর্ষার দিনে এ কথা তাহার হৃদয়ে প্রতীতি হয়না।
এ বর্ষাকে নিয়ে উৎসবেরও কমতি নেই। বিশেষ করে উপজাতীয় রাখাইনরা এ উৎসব পালন করে। রাখাইনদের এ উৎসবের সাথে বর্ষা এবং বৃষ্টির রয়েছে গভীর সম্পর্ক। এজন্য এ উৎসবকে বলা হয় বর্ষা উৎসব। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে সপ্তাহের কোন এক শুক্রবার ধরে বর্ষা উৎসব শুরু হয়। চলে আড়াই থেকে তিনমাস ধরে সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার। রাখাইনদের মতে, এটি তাদের আরেক সাংগ্রে উৎসব, যেন বৃষ্টির সাথে জলকেলী। যেদিন বৃষ্টি বেশী হয় সেদিন আনন্দের মাত্রাও বেড়ে যায়। মূলত তরুণ-তরুণীদের একে অপরকে জল ছিটানো, নানা মুখরোচক খাবার, নাচ ও গানের সাথে প্রাণের মেলা বয়ে যায়।
আষাঢ়-শ্রাবণে জলভারানত ঘনকৃষ্ণ মেঘরাশি আকাশ ছেয়ে রাখে। কখনোবা প্রাণনাথের মতো প্রকৃতিতে নামে বারিধারা। বর্ষায় প্রকৃতি সজল শ্যাম ঘন দেয়াকে জানায় উষ্ণ সম্ভাষণ, রূপ-রঙে হয়ে ওঠে ঢল ঢল। আকুতি জানায়: বারিধারে এসো চারিধার ভাসায়ে, বিদ্যুৎ ইঙ্গিতে দশ দিক হাসায়ে। জৈষ্ঠ্যের তাবদাহে চৌচির মাঠ-ঘাট খাল-বিল বন-বীথিকায় জেগে ওঠে নবীণ প্রাণের ছন্দ। চারিধারে অথৈ থৈ থৈ পানিতে আবহমান বাংলা হয়ে ওঠে অপরূপ রূপবতী সলিল দুহিতা। আষাঢ়-শ্রাবণ এদুমাস বাংলায় বর্ষা। কর্মহীন দিবস রজনী, উদাস মনের তোলপাড়, তপ্ত দীর্ঘশ্বাস আর দুজনে মুখোমুখি গভীর দুঃখে দুঃখী বর্ষাকে দেয় এক ভিন্ন মাত্রা। আর এই রূপময় লগনে নব চেতনায় জেগে উঠুক বাঙালি, বাংলাদেশ।

লেখক: সংস্কৃতিকর্মী, প্রাবন্ধিক, তালিকাভুক্ত গীতিকার ও নাট্যকার, বাংলাদেশ টেলিভিশন। সম্পাদক ও প্রকাশক, অমিতাভ (সমাজ-সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা)।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here