এদেশের বৌদ্ধদের হাজার বছরের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় বাঙালি জাতিসত্তা গঠনে, তার আত্মিক-মানসিক বিকাশে বৌদ্ধ সংস্কৃতি-সভ্যতা রেখেছে অনন্য অবদান। প্রাচীন বাংলাকে জানার জন্য নির্ভর করতে হয় বৌদ্ধ সমাজ-সংস্কৃতি-ইতিহাস-ঐতিহ্যের উপর।
প্রত্নতাত্ত্বিক খননে আবিষ্কৃত ঐতিহাসিক বৌদ্ধ বিহার-মন্দির-স্তূপের স্থাপত্যশৈলী, ভাস্কর্য, নানা ব্যবহার্য সামগ্রী ইত্যাদি পুরাবস্তুতে প্রতিফলিত হয় তৎকালীন প্রাচীন বাংলার সমাজ-সংস্কৃতি, রাজনীতি-অর্থনীতির স্বরূপ। এ পুরাকীর্তিগুলো জাতির গৌরবময় ইতিহাস-ঐতিহ্য আর আত্মপরিচয়ের স্মারক। অতীত মহাকালের খেরোখাতায় হারিয়ে গেলেও ঐতিহ্য অনুসন্ধান ও সংরক্ষণের মাধ্যমে নব প্রজন্মকে স্বকীয় সমৃদ্ধ ইতিহাস চেতনায় উজ্জীবিত করে।
অথচ এদেশের বৌদ্ধদের স্বকীয়তা বা জাতিসত্তার প্রকৃত মর্যাদা অর্জন করতে পারেনি একমাত্র আলাদা আইন না থাকার কারণে। কিন্তু মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টানদের আলাদা আইন রয়েছে। সে দিক দিয়ে বৌদ্ধদের ‘হিন্দু আইনের আওতায়’ চলতে হয়। ভিন্ন ধর্মাবলম্বী অনেকের ধারণা, হিন্দু-বৌদ্ধরা একই জাতি। এ- কী লজ্জার..!
জানি দীর্ঘকালের সংস্কার থেকে বেরিয়ে আসতে আমাদের আরো সময় লাগবে। তারপরেও বুঝতে হবে যুগের প্রয়োজনে, ভবিষ্যত প্রজন্মের নিরাপদ ও সুষ্ঠু জীবনযাপনে বৌদ্ধদের স্বতন্ত্র আইন প্রণয়ন অপরিহার্য। আইন প্রণয়ন এর উদ্যোগ যেভাবেই শুরু হোক না কেন, যারাই বা এতদূর এগিয়ে আনুক না কেন। আজকের দিনে এসে তো পেছনে ফিরে তাকালে চলবে না। নানা সময়ে নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে বৌদ্ধ পারিবারিক আইন আজ আলোর মুখোমুখি।
বৌদ্ধ পারিবারিক আইন প্রণয়ন বিষয়ে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থেকে তাঁদের মতামত ব্যক্ত করেছেন। বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের আয়োজনে উক্ত সভায় অনেকে পরামর্শ, মতামতকে ব্যক্ত করেছেন। মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকতেই পারে! যেকোন প্রতিকুলতাকে ডিঙিয়ে নানা পরামর্শ, অপরিহার্যতা এবং সম্ভাব্যতা সুবিবেচনায় এনে আলোর পথে নিয়ে যেতে হবে। প্রকৃতপক্ষে এ আইন প্রণয়নে সবাই আশাবাদী, ঐক্যবদ্ধ ও প্রত্যয়ী। একবাক্যে সবাই-ই চায় একটি জাতিসত্তার স্বকীয় মর্যাদা; অচিরেই আইন প্রণয়ন-বাস্তবায়ন প্রশ্নাতীতাবে প্রয়োজন।
তাই অনতিবিলম্বে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণপূর্বক বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবী ‘বৌদ্ধ পারিবারিক আইন’ প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যেতে হবে। কখন মহান জাতীয় সংসদে বৌদ্ধ পারিবারিক আইনটি উত্থাপিত হবে সময়ের গৌরবোজ্জ্বল অংশীদার হতে সমগ্র জাতি চেয়ে আছে।