বৌদ্ধদের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিটি উৎসব কোন না কোন বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিয়ে ভাস্বর। দিশেহারা মানবের মুক্তির পথ প্রদর্শক মহামতি গৌতম বুদ্ধের জীবনের বহুলতর ঘটনার প্রধান প্রধান অংশগুলিই উৎসবের অংগীভূত। মূলতঃ পূর্ণিমাকে ঘিরেই বৌদ্ধ উৎসব ও পার্বনগুলি প্রবর্তিত। যা আমাদের জাগ্রত করেÑ সত্য ও সুন্দরকে লালন করে গঠনমূলক পবিত্র কর্মের পথে এগিয়ে যাওয়ার সুদৃঢ় সংকল্প।
মহান প্রবারণা পূর্ণিমা বৌদ্ধদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। জীবন শুদ্ধিতা ও প্রজ্ঞাময় চৈতন্যের অন্বেষায় ত্রৈমাসিক বর্ষাব্রতের সফল সমাপ্তিতে বৌদ্ধরা উদ্যাপন করে এ পূর্ণিমা। বৌদ্ধ ভিক্ষুসংঘের আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিনমাসব্যাপী বর্ষাব্রত পালন ও গৃহীদের অষ্টশীল (অষ্টনীতি) অধিষ্ঠান শেষে আসে এ প্রবারণা। এ শুভ তিথিতে মনে জাগে বিশুদ্ধ আত্মচেতনা, সামাজিক মৈত্রী, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বাতাবরণ।
প্রবারণার পরদিন থেকে বিপুল ধর্মীয় মর্যাদায় মাসব্যাপী প্রতিটি বৌদ্ধ বিহারে প্রবারণা উৎসব অর্থাৎ ‘দানোত্তম শুভ কঠিন চীবর দানোৎসব’ উদ্যাপিত হয় বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে। উৎসবের অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ হচ্ছে আকাশপ্রদীপ উত্তোলন অর্থাৎ রঙিন ফানুস উড়ানো। এ ফানুস উড়ানোর বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। রাজকুমার সিদ্ধার্থ যখন রাজসুখ পরিত্যাগ করে স্ত্রী-সন্তানের মায়াজাল ছিন্ন করে ছন্দককে সঙ্গী করে অনোমা নদীর তীরে গিয়ে উপনীত হন। তথায় সিদ্ধার্থ নিজের মাথার চুল নিজ তলোয়ার দিয়ে ছেদন করে এই সত্যক্রিয়া করেছিলেনÑ “আমি যে উদ্দেশ্যে সংসারধর্ম ত্যাগ করে সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ করছি সে উদ্দেশ্য যদি পূর্ণ হয় তবে আমার এ চুলগুচ্ছ নিচে না এসে আকাশমার্গে উড়ে যাবে।” অমনিতেই তিনি আকাশমার্গে চুলগুচ্ছ ছুড়ে দেন। অতঃপর তা নিচে না এসে উর্ধ্বে উত্তিত হয়েছিল। সেই উত্থিত কেশরাশি স্বর্গের দেবরাজ ইন্দ্র নিয়ে গিয়ে স্বর্গে চুলামনি জাদি নির্মাণ করেন।
এরই আলোকে প্রবারণা পূর্ণিমায় সবাই বিহারে সমবেত হয়ে তথাগত গৌতম বুদ্ধের চুলধাতুকে পূজা করার মানসে আকাশে ফানুস উড়ায়।সদ্ধর্মাচারের পরম আরাধ্য অনুষ্ঠান এ প্রবারণা পূর্ণিমা উৎসব বৌদ্ধদের কাছে ধর্ম, সমাজ ও জ্ঞাতি-সম্প্রীতির নানামাত্রিক সম্মিলনের পরিচয় বহন করে। আজ হিংসা ও সংঘাতে ভরা, রিক্ত ধরণীতে শরতের নির্মল প্রকৃতির উদার পরিম-লে সৃষ্টি হয়েছে এক শান্ত মধুর মানবিক ও মৈত্রীর সাবলীল চেতনা।পাঠকের চাহিদার কথা বিবেচনা করে অমিতাভ’র এবারের সংখ্যা হতে ইংরেজি প্রবন্ধ সন্নিবেশিত হয়েছে। আগামীতে এ ধারা অব্যাহত রাখার দৃঢ় প্রত্যাশা রাখি।প্রবারণার পুণ্যালোকে সকলের জীবন হোক সমৃদ্ধ।