মহাস্থানগড়ের বয়স প্রায় আড়াই হাজার বছর। ১৫০০ সাল পর্যন্ত করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে গড়ে ওঠা এ মহাস্থানগড়ই ছিল তখনকার মানুষের রাজধানী। প্রসিদ্ধ এই নগরী ইতিহাসে পুণ্ড্রবর্ধন বা পুণ্ড্রনগর নামেও পরিচিত ছিল।
নাজমুল করিম ফারুক :
মহাস্থানগড়ের বয়স প্রায় আড়াই হাজার বছর। ১৫০০ সাল পর্যন্ত করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে গড়ে ওঠা এ মহাস্থানগড়ই ছিল তখনকার মানুষের রাজধানী। প্রসিদ্ধ এই নগরী ইতিহাসে পুণ্ড্রবর্ধন বা পুণ্ড্রনগর নামেও পরিচিত ছিল। যখন ইউরোপ-আমেরিকা সভ্য হতে শেখেনি, তখন থেকেই এ অঞ্চলে লোক আসত ব্যবসা-বাণিজ্য করতে। মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন এবং আরও অনেক হিন্দু রাজারা এ অঞ্চলকে বানিয়ে ছিলেন তাদের প্রাদেশিক রাজধানী। ওই রাজধানীর ধ্বংসাবশেষের নিদর্শনগুলো যেখানে অক্ষত রয়ে গেছে সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে আজকের মহাস্থানগড়।
বগুড়া শহরে পা ফেলে দেহ-মনটাকে শীতল করে হাজির হলাম হজরত শাহ্ সুলতান বলখী (রহ.) মাহী সওয়ারের মাজারে। যা মহাস্থানগড় দুর্গপ্রাচীরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত। দশম শতকের মধ্যবর্তী সময়ে এখানে রাজত্ব করেন রাজা নরসিংহ বা পরশুরাম। কথিত আছে হজরত মীর বোরহান নামক একজন মুসলমান এখানে বাস করতেন। পুত্র মানত করে গরু কোরবানি দেয়ার অপরাধে রাজা পরশুরাম তাকে বলির আদেশ দেন। হজরত মীর বোরহানকে সাহায্য করতে এবং রাজা পরশুরামকে উচ্ছেদ করেন হজরত শাহ্ সুলতান বলখী (রহ.) মাহী সওয়ার। ধর্ম প্রচারক শাহ্ সুলতান বলখী (রহ.) সম্পর্কে রয়েছে আশ্চর্য কিংবদন্তি। শোনা যায়, তিনি মহাস্থানগড় অর্থাৎ প্রাচীন পুণ্ড্রনগরে প্রবেশ করার সময় সেকালের বিশাল ও প্রাচীন করতোয়া নদী পার হয়েছিলেন একটা বিশাল আকৃতির মাছের পিঠে চড়ে। এ জন্য তার নামের শেষে উল্লেখ করা হয় মাহী সওয়ার বা ?মাছের পিঠে আরোহণকারী?। সমতলভূমি থেকে মাজারটি অবস্থিত টিলার ওপর ওঠার জন্য রয়েছে ধাপবিশিষ্ট সিঁড়ি। মাজার চত্বরে রয়েছে একটি প্রাচীন কুয়া ও অনেক বেদি। এ ছাড়া অতিথিদের জন্য রান্নার জায়গা ও বিশ্রামের ছাউনি। ব্রিটিশ শাসনামলে এ মাজার থেকেই ফকির বিদ্রোহের কর্মসূচি পরিচালিত হতো। প্রতিবছর বৈশাখের শেষ বৃহস্পতিবার মাজারটি ঘিরে বিশাল এক মেলার আয়োজন হয়। মাজারের পাদদেশে মোগল সম্রাট ফাররুক শিয়ারের রাজত্বকাল ১৭১৯ সালে নির্মিত প্রাচীন মসজিদটিও অনেকের দৃষ্টি কাড়ে। মাজারটি পরিদর্শন শেষে অটোবাইক নিয়ে সোজা মহাস্থানগড়ের উত্তর দিকে অবস্থিত প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের জাদুঘর বা মিউজিয়ামে। জাদুঘরে প্রবেশের আগেই মনটা জুড়িয়ে গেল নানা রঙের ফুল আর ফলের সুদৃশ্য বাগান আর বেশকিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নমুনার স্পর্শে।
টিকিট কেটে জাদুঘরে প্রবেশ করে দর্শন মিলল মহাস্থানগড় ও আশপাশের অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা অসংখ্য প্রত্নবস্তুর নমুনার সঙ্গে। মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও অন্যান্য রাজবংশের অসংখ্য স্মৃতিচিহ্ন এখানে যত্নের সঙ্গে সংরক্ষিত আছে। রয়েছে কালো পাথরে খোদাইকৃত দেব-দেবীর মূর্তি, ধ্যানমগ্ন বৌদ্ধমূর্তি, নকশা করা ইট-পাথরের টুকরা ও মূল্যবান পাথরের অলঙ্কার। আরও রয়েছে বিভিন্ন ধাতুর তৈরি অস্ত্র ও পাত্র, মুদ্রা ও স্মারক। এখানেই পাওয়া গেল মহাস্থানগড়ের পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র। মানচিত্রে চোখ পড়তেই দৃষ্টি গেল গোবিন্দ ভিটার দিকে। কিছু তথ্য কিছু ছবি, এবার গোবিন্দ ভিটায় চলি।
স্থানীয়ভাবে গোবিন্দ ভিটা নামে পরিচিত এ প্রত্নস্থলটি করতোয়া নদীর বাঁকে মহাস্থানগড় দুর্গ নগরীর সন্নিকটে উত্তর দিকে অবস্থিত। খ্রিস্টীয় ১২০০-১৩০০ শতকে রচিত সংস্কৃতি গ্রন্থে ?করতোয়া মহাত্ম্য? এ মন্দিরটির কথা উল্লেখ রয়েছে। এটি গোবিন্দ বা বিষ্ণু মন্দির নামে পরিচিত হলেও এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যার সাহায্যে এ পুরাকীর্তিকে বৈষ্ণব মন্দির বলা যেতে পারে। এখানে সর্বপ্রথম ১৯২৮-২৯ সালে এবং পরে ১৯৬০ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে খ্রিস্ট পূর্ব ২য় শতক থেকে শুরু করে বিভিন্ন যুগের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। তবে গুপ্ত পূর্ব যুগের উল্লেখযোগ্য কোনো স্থাপত্যিক কাঠামো পাওয়া যায়নি। খননের ফলে যেসব ইমারত উুোচিত হয়েছে তার মধ্যে পূর্ব ও পশ্চিমের দুটি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মন্দির দুটি একটি মজবুত সীমানা প্রাচীরের মধ্যে অবস্থিত, যা শেষ গুপ্ত (ষষ্ঠ শতক) যুগ থেকে মুসলমান যুগ পর্যন্ত মোট চারটি পর্যায়ে বিভক্ত। এই গোবিন্দ ভিটা থেকে সংরক্ষণ করা হয় ছাঁচে ঢালা তাম্র মুদ্রা, রৌপ্য মুদ্রা, উত্তর ভারতীয় কালো চকচকে মৃৎপাত্রের টুকরা, শুঙ্গ যুগীয় শিল্প বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত পোড়ামাটির ফলক, ব্রাহ্মী হরফ সংবলিত পোড়ামাটির সিল, স্বল্প মূল্যবান পাথর গুটিকা।
দৃষ্টিনন্দন প্রাচীন সিঁড়ি বেয়ে আমরা মূল মহাস্থানগড়ের ওপর। দুর্গনগরীর প্রাচীর ঘেরা অস্বাভাবিক উচ্চভূমি। দীর্ঘাকৃতির এ প্রাচীরই বলে দেয় সমৃদ্ধ সেই নগরবাসীরা নিরাপত্তাকে কতটা গুরুত্ব দিত। লাখ লাখ পোড়ামাটির ইট আর সুরকি দিয়ে ১ বর্গমাইল এলাকা ঘিরে ফেলা হয়েছে, নিজের চোখে না দেখলে এ বর্ণনা বিশ্বাস করা কঠিন। দেয়ালের মতো যে বিশাল কাঠামো মহাস্থানগড়কে ঘিরে রেখেছে তার দৈর্ঘ্য ৫০০০ ফুট আর প্রস্থ ৪৫০০ ফুট। সমতলভূমি থেকে এ দেয়ালের উচ্চতা ১৫ থেকে ৪৫ ফুট। প্রাচীরটি যথেষ্ট চওড়া। ৫ থেকে ১০ ফুট প্রশস্ত এই প্রাচীরের উপরিভাগ দেখতে চীনের গ্রেটওয়ালের মতো।
মহাস্থানগড়ের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে হেঁটে আসতে আসতে আর ছবি তুলতে তুলতে দেহটা ক্লান্ত হয়ে গেল। অল্প কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে অটোবাইক ধরে বেহুলার বাসরঘর। নিয়মানুযায়ী টিকিট কেটে প্রবেশ করলাম আর ঢালায়ের পথ ধরে ইতিহাসের খোঁজে এগিয়ে এলাম বেহুলার বাসরঘরে। বগুড়া শহর থেকে ১০ কিলোমিটার উত্তরে এবং মহাস্থানগড় থেকে ২ কিলোমিটার দক্ষিণে গোকুল গ্রামের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে যে স্মৃতিস্তূপটি যুগযুগ ধরে অতীতের অসংখ্য ঘটনাবলীর নিদর্শন বুকে জড়িয়ে শির উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এটাই বেহুলার বাসরঘর নামে পরিচিত। এ বাসরঘর মেড় থেকে মেধ এবং বর্তমানে পুরার্কীতি নামে পরিচিত। তবে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের মতে, আনুমানিক খ্রিস্টাব্দ সপ্তম শতাব্দী থেকে ১২০০ শতাব্দীর মধ্যে এটা নির্মিত। ইস্টক নির্মিত এ স্তূপটি পূর্ব পশ্চিমে অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ এবং ত্রিকোণবিশিষ্ট ১৭২টি কক্ষ, অকল্পনীয় এ কক্ষগুলোর অসমতা এবং এলোমেলো বুনিয়াদের বোধগম্যতাকে আরও দুর্বোধ করে তুলেছে। বেহুলার কাহিনী সেন যুগের অনেক পূর্বেকার ঘটনা। বেহুলার বাসরঘর একটি অকল্পনীয় মনুমেন্ট।
আদি রূপ কিন্তু বর্তমানে নতুন সাজে সেজেছে ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়। কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে বসা আড়াই হাজার বছর আগের প্রাচীন বাংলার রাজধানী এ দর্শনীয় স্থানটি এখন সাজছে নতুন রূপে। বাংলার সর্বপ্রাচীন রাজধানী পুণ্ড্রনগরের অসংখ্য পুরাকীর্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মহাস্থানগড়ে অতি সম্প্রতি করা হয়েছে সংস্কার কাজ, দর্শনার্থীদের জন্য নির্মাণ হয়েছে আকর্ষণীয় পিকনিক স্পটসহ বিভিন্ন স্থাপনা। সাউথ এশিয়ান ট্যুরিমজম ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (এসএটিআইডিপি) বা দক্ষিণ এশীয় পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে এ অবকাঠামো নির্মাণ ও সংস্কার কাজে অর্থায়ন করছে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)। ?সার্ক সাংস্কৃতিক রাজধানী? উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে পর্যটকদের মাঝে নতুন চেহারায় হাজির হবে ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়। একটু সময় করে চলে আসুন সেই জনপদে, যেখানে সাঙ্গ হবে আরও ভাসু বিহার বা নরপতির ধাপ, যোগীর ভবনের মন্দির, জিউৎকুণ্ড, শিলা দেবীর ঘাট, কালীদহ সাগর, নান্দাইল দীঘি, ওঝা ধন্বন্তরীর বাড়ি, চাঁদ সওদাগরের বাড়ি, তোতারাম পণ্ডিতের ধাপ বা বিহার ধাপ।
যাতায়াত
ঢাকা থেকে খুব সহজেই সড়কপথে বগুড়া যাওয়া যায়। রাজধানীর কল্যাণপুর, গাবতলী ও মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রতি ৩০ মিনিট পরপর বাস ছাড়ে। এসআর, শ্যামলী, টিআর, হানিফ, বাবলু, শাহ্ ফতেহ আলীসহ অনেক পরিবহন সংস্থার বাস চলাচল করে এ রুটে। সময় লাগে ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা এবং ভাড়া পড়বে ৩৫০ থেকে ৭০০ টাকা। কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ট্রেনেও বগুড়া আসা যায়। ?রংপুর এক্সপ্রেস? ও ?লালমনিরহাট এক্সপ্রেস? নামের দুটি ট্রেন পাবেন এখান থেকে। বগুড়া শহরের হাড্ডিপট্টি বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে এবং দত্তবাড়ী থেকে টেম্পো অথবা অটোরিকশায় চড়ে আধা ঘণ্টার মধ্যেই পা রাখা যাবে মহাস্থানগড়ে।
থাকা-খাওয়া
মহাস্থানগড়ে রাত যাপনের মতো ভালো কোনো হোটেল নেই। তাই থাকার জন্য বেছে নিতে পারেন বগুড়া শহরের হোটেলগুলো। সব ধরনের ও মানের থাকা-খাওয়ার জায়গা পাবেন এখানে। ৫০০ টাকা থেকে ২০০০ টাকায় রাত যাপনের ভালো ব্যবস্থা হয়ে যাবে। বেছে নিতে পারেন শহরতলির বগুড়া-রংপুর মহাসড়কে মহাস্থান থেকে ৬-৭ কিলোমিটার দক্ষিণে নওদাপড়ায় টিএমএসএস সিএনজি পাম্পের পাশে অত্যাধুনিক নির্মাণশৈলীসহ আভিজাত্যময় নবনির্মিত চার তারকা ?হোটেল মম ইন?, ছিলিমপুরে বগুড়া-ঢাকা মহাসড়কের পাশে ফোর স্টার হোটেল ?নাজ গার্ডেন?, শহরতলির চারমাথা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের পাশে হোটেল ?সেফওয়ে? ও ?সেঞ্চুরি মোটেল?, বনানীতে ?সিয়াস্তা? কিংবা ?পর্যটন মোটেল?, দ্বিতীয় বাইপাসে মাটি-ডালি মোড়ের কাছে ক্যাসেল ?সোয়াদ? কিংবা বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথার কাছে শেরপুর রোডে মফিজপাগলার মোড়ে অবস্থিত ?ম্যাক্স মোটেল?। চাইনিজ, বাংলাসহ সব ধরনের খাবারের ব্যবস্থা আছে সবখানেই। তবে বগুড়া এলে এখানকার প্রসিদ্ধ দই, ক্ষিরসা ও মহাস্থানগড়ের ?কট্কটি? নিতে ভুলবেন না।