স্কুলপাঠ্য বইয়ের একটা বালবোধ্য লেখা থেকে আমরা গৌতম বৃদ্ধ সম্পর্কে প্রথম জ্ঞান লাভ করি। একজন রাজার কুমার, নাম সিদ্ধার্থ রথে চড়ে একদিন ভ্রমণ করতে করতে জরা মৃত্যু প্রভৃতি কয়েকটি দৃশ্য দেখতে পান এবং অতঃপর তিনি প্রাসাদ ত্যাগ করে এক অশ্বত্থ গাছের তলায় বসে তপস্যা শুরু করেন।
আলাউদ্দিন আহমদ:
গৌতম বুদ্ধ সম্পর্কে এই প্রাথমিক জ্ঞান কমবেশি আমাদের সকলের মধ্যেই অদ্যাবধি কাজ করে।। আমরা জানি; যে অশ্বত্থ গাছের তলায় বসে তিনি ধ্যান করেছিলেন সেই গাছটার নাম একালের জ্ঞানীরা দিয়েছেন বোধিদ্রুম, বোধিবৃক্ষ। এই সেদিন পর্যন্ত আমাদের অনেকের মনে এই ভ্রান্ত ধারণা বলবৎ ছিল যে, বোধিবৃক্ষ বুঝি ভিন্ন কোনো জাতের গাছ। সেই বোধি বৃক্ষের এমনই মহিমা যে তার তলায় উর্ধ্ববাহু মৌনিবাবা হয়ে কিছুুদিন যাপন করলেই জ্ঞান লাভ আপনা আপনিই হয়ে যায়। বড় হবার পর গৌতম বুদ্ধ সম্পর্কে যত লেখা পড়েছি, কোথাও সিদ্ধার্থ গৌতমের বুদ্ধত্ব লাভ নিয়ে যে বালবোধ্য উপাখ্যান প্রচারিত আছে, তার প্রতিবাদ কেউ করেন নি বা তা নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন তোলেন নি। বুদ্ধত্ব মানে যদি জ্ঞান প্রজ্ঞা ইত্যাদি হয়, যা একান্তই মানবমস্তিষ্কঘটিত, সেরিব্রাল ফ্যাকাল্টির বিষয়, কিভাবে তা পূর্বাচার্যদের এবং সমকালীন বিদ্যানদের রচনা পাঠ না কের এক ছায়ানিবিড় গাছের তলায় বসে থেকে লাভ করা যায় তা বুদ্ধির অগম্য। জ্ঞান অর্জন সম্পর্কিত প্রচলিত সব ধারণাই বিরোধী এই উপাখ্যান।
সাবেক ভারতবর্ষে জ্ঞান সম্পর্কে বিচিত্র সব ধারণা প্রচলিত ছিল। জ্ঞানের ভাগও ছিল পরা অপরা।
পরা বিদ্যা অপরা বিদ্যা। চরম জ্ঞান লাভের জন্য সে কালে যে সব কায়দা কানুন চালু ছিল, একালের জ্ঞানপিপাসুরা তা অনুশীলন করতে প্রবৃত্ত হবেন না। জ্ঞানের পিপাসা যতই অনির্বাণ, কেউ গাছের পাতামাত্র আহার করে উর্ধ্ববাহু হয়ে দিনের পর দিন বছরের পর বছর কাটাতে রাজী হবেন না। দুই ক্লাস মাত্র পড়েছে বা পড়ছে এমন একটা শিশুও বিশ্বাস করবে না এই উপায়ে জ্ঞান লাভ হতে পারে। আমরা পরে দেখবো, গৌতম বুদ্ধের বুদ্ধ হওয়া নিয়ে যেসব উপাখ্যান প্রচলিত আছে তা দেশজোড়া এক ষড়যন্ত্রেরই ফল। গৌতম বুদ্ধের কালটা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বুদ্ধের কালে বিশাল ভারতবর্ষ (মহাভারত গ্রেটার ইন্ডিয়া) পুরোপুরি রাজতন্ত্রের কুক্ষিতে আসেনি। সে কালের শ্রেণীহীন উপজাতীয় গণসংগঠনগুলি ধ্বংস করে তারই ধ্বংসস্তুপের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রাজতন্ত্র ব্যাক্তি বা গোষ্ঠীর শাসন এই চালু কথাটুকু ছাড়া ইতিহাসে বেশি কিছু নেই। ভারতবর্ষেরও বিভিন্ন অঞ্চলে যে গণসংগঠনগুলি চালু ছিল সে গুলি নানা উপায়ে ধ্বংস করা হয়। এই ধ্বংস কাণ্ডের বিস্তৃত এবং প্রামাণিক বিবরণ পাওয়া যাবে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র নামক বিখ্যাত গ্রন্থে।
সে কালের উপজাতীয় গণসংগঠন গুলিই ছিল একমাত্র সামাজিক সংগঠন। শুধু ভারতবর্ষের ইতিহাসের ক্ষেত্রেই নয়, সারা পৃথিবীর ইতিহাসেই এটা দেখা গেছে। সে কালের স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে উঠা গণসংগঠন ভেঙে রাজতন্ত্র কায়েমের অতি নিষ্ঠুর অতি কদর্য আর বীভৎস বিবরণ ইতিহাসে নেই।
নেই কেন আমরা যদি এই প্রশ্নটা দিয়েই শুরু করি আমাদের ইতিহাস অনুসন্ধান, অজানা অনেক কিছুই আমাদের গোচরে আসবে। হেনরি মর্গান আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলের গণসংগঠনের উদ্ভব ও বিকাশ সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন।
ভারতবর্ষের গণসংগঠন নিয়ে তেমন কোনো গবেষণা হয় নি। কলম্বাসের আমেরিকা অভিযানের আগে পর্যন্ত আমেরিকার আদি অধিবাসীরা তাদের জীবন তাদের নিজস্ব ধরনে শান্তিপূর্ণ ভাবেই যাপন করতে পেরেছিল, কিন্তু ভারতবর্ষীয় জনগণের দুর্ভাগ্য হলো, কলম্বাসের আমেরিকা অভিযানের অনেক আগে বহিরাগত আর্যরা ভারত দখল করে এবং স্বাধীন স্বনির্ভর শ্রেণীহীন গণসংগঠনগুলি ধ্বংস করে রাজতন্ত্র ও ব্যক্তির শাসন কায়েম করে।
সভ্য দুনিয়ায় একটা মত চালূ আছে বহিরাগত আর্যরা ভারতবর্ষকে সভ্য করেছে। অন্ধকার ভারতবর্ষে আলোকবর্তিকা হাতে আর্যদের শুভাগমন, অতঃপর মহান ভারতীয় সভ্যতার বিকাশ। গৌতম বুদ্ধের সমগ্র জীবন ছিল এই ঐতিহাসিক মিথ্যার যবনিকা উম্মোচনের কাজে নিবেদিত। ভারতবর্ষে গণসংগঠন ধ্বংস, এবং সেই ধ্বংসস্তুপের উপর রাজতন্ত কায়েমের ইতিহাসে, কূট বুদ্ধিতে পার্থসারথি, ভারত পুরাণের শকুনিতুল্য এক মূর্ত নীতিহীনতা চাণক্য কখনো কৌটিল্য নামে কুখ্যাত এক ব্যক্তির ওতপ্রোত সংশ্লিষ্টতা দেখা যায়।
আমরা দেখবো আর্য অভিযানকারীরা এদেশে আলোর মশাল হাতে আসে নি। সভ্যতার আলো আগেই প্রজ্বলিত হয়েছিল এ দেশে। সভ্য ভারতবাসীর তুলনায় আর্যরা ছিল আধা বর্বর। মানব সভ্যতার ভিত্তি যে কৃষি তা তারা জানতো না। আধুনিক যুগে যে সাম্য মৈত্রী ও স্বাধীনতা আমাদের সব; সংগ্রামের, সব যুদ্ধের মূল ধ্বনি, তাই ছিল সেকালের গণ সংগঠনগুলির ভিত্তি ও আদর্শ। চীন বিপ্লবের পর চীনা নেতারা গণ কমিউনভিত্তিক চীনা সমাজ গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। বিপ্লবের পরে খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবে কমিউন এক সময় সারা বিশ্বের জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল এমন অভূতপূর্ব মাত্রায় যে, এরই উপর ভিত্তি করে চীন দেশে তা বটেই বিশ্বের নানা ভাষায় সাহিত্যই গড়ে উঠেছিল বিশাল। আমাদের বাংলা ভাষাতেও খোঁজ করলে পাওয়া যাবে চীনা গণকমিউন এর প্রশংসার পঞ্চমুখ বেশ কয়েকখানা গ্রন্থ। পশ্চিম বাংলায় লেখা হয়েছে আরো বেশি।
কী ছিল গণকমিউনের অর্থনৈতিক ভিত্তি? কী ছিল মূল আদর্শ? সাম্য। স্বাভাবিক সাম্য এবং স্বাধীনতা প্রাণের চেয়ে প্রিয়। সম্পদের মালিক ব্যক্তি নয় সংগঠন।
গৌতম বুদ্ধের অনুসরণে আমরা দেখবো সে কালের গণসংগঠনগুলির আদর্শ ছিল কত মহান। মানুষে মানুষে কোন ভেদ নেই, সব মানুষ সামন, অধিকারে ভেদ নেই, সব মানুষের অধিকার সমান, সব মানুষের মন সমান। প্রায় তিন হাজার বছরের পুরনো সেই আদর্শ, সেই মূল্যবোধ, একাল পর্যন্ত বয়ে এনেছে মানুষ বংশপরম্পরায়। হেগেল বলেছিলেন, ভারতবর্ষের কোনো ইতিহাস নেই। ক্ষোভে না মনঃপীড়ায়, মার্কস বলতে পারবেন। তাঁর কথাগুলো সংক্ষেপে একটা উপমায় বলা যায়। ভারতবর্ষ যে উদ্ধারণপুরের ঘাট, শবভূক শিবা আর সারমেয় শুয়ে থাকে পাশাপাশি। মিথ্যা কথা। ভারতবর্ষের ইতিহাস আছে। অতি গৌরবময় ইতিহাস আছে ভারতের। ইতিহাসরূপে হয়তো নেই, আছে কাব্য সাহিত্য পুরাণরূপে। সেকালের ইতিবৃত্ত লেখকদের রচিত নানা উপাখ্যানে নানা পুরাণ কথায় যে সব যুদ্ধের কাহিনী বর্ণিত আছে দেব্যসুরের যুদ্ধের কাহিনীতে, সেই সব যুদ্ধ দেবতা আর দৈত্য-দানব, যক্ষ-রাক্ষসদের মধ্যে হয়নি, হয়েছিল মানুষে মানুষে। সেই সবই ইতিহাস, ভারতবর্ষে শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস। সংকীর্ণ ভাববাদী দৃষ্টি নিয়ে হেগেল তা দেখতে পাননি।
সেকালের গণ সংগঠনগুলির মূল আদর্শ ছিল সাম্য ও স্বাধীনতা। রাজকুমার সিদ্ধার্থ জরা আর মৃত্যু দেখেছিলেন। দারিদ্র্য দেখেননি, মানুষের সব সদগুণের যে ঘাতক। জরা মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর। জরা মৃত্যু মনুষ্যজীবনে বা অন্য যে কেনো প্রাণীর জীবনে অতিস্বাভাবিক একটা ঘটনা। এর কোনো নিরাকরণ নেই। সিদ্ধার্থ জরা মৃত্যু নিরাকরণের জন্য রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করেন নি। বস্তুতঃ দারিদ্র্যই দেখেছিলেন সিদ্ধার্থ গৌতম এবং তা নিরাকরণের জন্য পথে নামেন। তিনি বুঝেছিলেন, দারিদ্র্য মনুষ্যসৃষ্ট। গণদারিদ্র ঈশ্বরসৃষ্ট বলে যা বলা হয় তা মিথ্যে কথা। মনুষ্যসৃষ্ট এই দারিদ্র্য মনুষ্যত্ব বিকাশের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। তাই প্রকৃতিপ্রদত্ত দুঃখ নয়, মনুষ্যসৃষ্ট দুঃখ যা নিরাময় যোগ্য, মনুষ্য সমাজ থেকে দূর করার জন্য তিনি রাজসুখ চির জীবনের মতো পরিত্যাগ করে দুঃখী মানুষের কাতারে নেমে আসেন। গৌতম বুদ্ধ সম্পর্কে একালের অতিকথাগুলি বাদ দিলে, গৌতম বুদ্ধ ছিলেন একালের কার্ল মার্কস ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলস প্রমুখের গুর স্থানীয়। ইতিহাসে অগ্রজ তো বটেই।
মানুষ্য সৃষ্ট দুঃখ দূরীকরণের গৌতম ব্দ্ধু-প্রদর্শিত উপায়ের কথা একালের বৌদ্ধরা অনেক আগেই ভুলে গেছেন। এই নিরীশ্বরবাদী পণ্ডিত গৌতম বুদ্ধের একশ’ বছর পর বৌদ্ধদের যে মহাসম্মেলন হয়েছিল, সেই সম্মেলনেই বৌদ্ধরা মহাযান ও হীনযান ভাগ হয়ে যান। পরে এই দুই যান ভেঙে আরও যান হয়েছিল। বজ্রযান, সহজযান প্রভৃতি। বহু ভাগে বিভক্ত বৌদ্ধরা প্রথমে যে ঐতিহাসিক দুষ্কর্মটি করেন সেটি হলো, যে-গৌতম বুদ্ধ ভগবানে বিশ্বাস করতেন না তাকেই ভগবান বানিয়ে ভগবান তথাগত নামে অষ্টবিধ বা বহুবিধ পূজার ব্যবস্থা করা। বস্তুবাদী বুদ্ধের উদ্ভাবিত প্রতীত্যসমুৎপাদ তত্ত্ব কোথায় গেছে কে রাখে তার খবর। দর্শনের ছাত্ররা প্রতীত্যসমুৎপাদ সূত্র মুখস্থ করে পরীক্ষা পাশের জন্য। ঐ পর্যন্তই। বৌদ্ধসমাজে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে এই তত্ত্বের কোনো প্রয়োজন নেই।
গৌতম বুদ্ধের পর এই হাজার আড়াই বছরে জগতের অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। তাঁর কালেই স্বাধীন ও স্বনির্ভর গণসংগঠনগুলিতে ভাঙন শুরু হয়েছিল। গৌতম বুদ্ধ মানুষের মুক্তির যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁর জীবদ্দশাতেই তা খান খান হয়ে যাচ্ছিল। তাঁর ব্যক্তিগত বন্ধু বিম্বিসার তাঁর ছেলে অজাতশত্র“র হাতে নিহত হন। অজাতশক্র নিহত হন তৎপুত্র অনিরুদ্ধের হাতে। এমন ভাবে পর পর পাঁচ পুরুষ ধরে চলে পিতৃহত্যা আর সিংহাসন দখল। গৌতম বুদ্ধ নিশ্চয় এসব দেখে যান নি। তাঁর মৃত্যুর একশ বছরের মধ্যে তাঁর প্রদর্শিত দুঃখ নিবারণের বাস্তব উপায়সমূহ অষ্টবিধ আধ্যাত্মিক উপায়ে অধঃপতিত হয়। বুদ্ধের কালে তাঁর সমকক্ষ বিদ্বান সর্বশাস্ত্রে পণ্ডিত আর একজনও ছিলেন না। বহির্বিশ্বে ভারতের গৌরবের অনেকখানি ধারণ করেন গৌতম বুদ্ধ। ভারত গৌতম বুদ্ধের দেশ। নবম শতাব্দীতে ভারতে বৌদ্ধ প্রাধান্য খর্ব করে হিন্দু পুনর্জাগরণের এক দুর্মর তৎপরতা শুরু করেন শংকরাচার্য ও তাঁর সহযোগী বেদান্ত-বাগীশ পণ্ডিতেরা। বৌদ্ধরা বুদ্ধের জন্মভূমি ও কর্মক্ষেত্র ছেড়ে প্রাণ রক্ষার্থে চীন জাপান সিংহল প্রভৃতি দেশে পলায়ন করেন। শংকরাচার্যের নেতৃত্বে সারা ভারতে অনেকগুলি কেন্দ্র (মঠ) গড়ে তোলা হয়। এই সব কেন্দ্র থেকে একযোগে সমবেত আক্রমণ চালিয়ে ইতিহাসের এক জঘন্য গণহত্যা সম্পন্ন করা হয়। যার সঙ্গে তুলনীয় হাল আমলে ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্টনিধন। নবম শতাব্দীতে সংঘটিত বৌদ্ধ গণহত্যার বিবরণ ইতিহাসে লেখা হয় নি। এ সংক্রান্ত বিবরণ সামান্য কিছু পাওয়া যাবে ড. তারাচাঁদের ইনফ্লুয়েন্স অব ইসলাম অন ইন্ডিয়ান কালচার গ্রন্থে। আজকের বৌদ্ধরা সেই নির্মম ইতিহাস স্মরণে রাখেন নি।
পৃথিবীতে বহু ধর্ম আছে। তার মধ্যে প্রধান ধর্ম ছয়টি। যে গুলিকে বিশ্ব ধর্ম বলা হয়। ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলাম এই তিনটি ঐশী গ্রন্থভিত্তিক ধর্ম। এরপর সনাতন ধর্ম যা বৈদিক ধর্ম হিসেবে অধিক পরিচিত। আর একটা ধর্ম আছে জরথুষ্ট্রিয় মত। এই পাঁচটি ধর্মেরই কেন্দ্রে আছে ঈশ্বর। বৌদ্ধ ধর্ম একমাত্র নিরীশ্বরবাদী ধর্ম। প্রাতিষ্ঠানিক এসব ধর্মের প্রবর্তনের আগে ছিল সর্বপ্রাণবাদ। একেশ্বরবাদী ধর্মগুলির প্রবর্তনের পর সর্বপ্রাণবাদ ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়। বৌদ্ধ ধর্মকে ধর্ম না বলে মত বলাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত।
বুদ্ধ নিজেও তাঁর প্রচারিত মতকে মত বলতেই পছন্দ করতেন। বুদ্ধের মতকেই বৌদ্ধ ধর্মে অধঃপতিত করা বুদ্ধপরবর্তী বৌদ্ধদের এক অতুলনীয় কীর্তি। গৌতম বুদ্ধ সম্পর্কে যেসব উপাখ্যান তৈরি হয়েছে বুদ্ধের প্রচারিত মতের সঙ্গে তার কিছুমাত্র সঙ্গতি নেই। বুদ্ধের সমসাময়িক বিদ্বানদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন ভাববাদী। প্রাচীন ভারতের চার্ব্যকপন্থীদের সঙ্গে তাঁর মতের বিলক্ষণ সাদৃশ্য ছিল। আধুনিক যুগে দ্বান্ধিক বস্তুবাদ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। অনকন্ট্রাডিকশন, অন প্রাকটিস প্রভৃতি গ্রন্থে বস্তুবাদকে অনেক বিশদ করা হয়েছে। বস্তুবাদের মূলকথা, কাল নিরবধি জগৎ পরিবর্তনশীল। বুদ্ধ উদ্ভাবিত প্রভীত্যসমৎপাদ তত্ত্বেরও মূল কথা তাই। কালক্রমে বৌদ্ধমত বহুভাবে ভাগ হয়ে গেছে। আদি বৌদ্ধ মতের সঙ্গে পরবর্তীকালের আনা ভাববাদী বৌদ্ধদের অনেকের কাছে প্রভীত্যসমুৎপাদ অতি অসত্য নিন্দনীয়ও ‘সাধুজনের’ অতিঅপ্রিয় মতবাদ। ঐতিহাসিক বিচারে বুদ্ধ প্রণীত প্রভীত্যসমুৎপাদ তত্ত্ববাদ দিলে গৌতম বুদ্ধের আর কোন বিশেষত্ব থাকে না। আর পাঁচজন ধর্ম প্রচারকের মতো বুদ্ধও বৈশিষ্ট্যহীন হয়ে পড়েন।
কিন্তু আসল ইতিহাস তো ভিন্ন। খ্রিষ্টজন্মের পাঁচশত বছর আগের একজন মানুষকে যদি তাঁর প্রকৃত পরিচয়ে পরিচিত করা হয়, যদি বলা হয় বুদ্ধ তাঁর কালের সমুদয় অনাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন এবং সমাজে ধর্মের নামে বৈদিক যাগযজ্ঞভিত্তিক ব্যাপক অপচয়, ভোগ ও আনুষাঙ্গিক বহুবিধ অসামাজিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন তাতে বুদ্ধ গৌতমের যে ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, সেই ভাবমূর্তিতে বুদ্ধকে প্রতিষ্ঠিত করতে দেশী বিদেশী সমাজপতিরা কেউ চান নি। আজকের দিনেরদ এই হানাহানি আর রক্তপাতময় বিশ্বে গৌতম বুদ্ধ একজন অহিংস মতের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে খ্যাত। তাঁর খ্যাতি, আসলে অখ্যাতি, যাঁদের প্রচারের ফলে সম্ভব হয়েছে, তাঁরা কেউ আদি বুদ্ধ মতের সমর্থক ছিলেন না।