জীবনের সাথে আনন্দের অনুসন্ধান

0
12

জীবন সম্পর্কে যদি বলি, পৃথিবীতে স্বর্ণালী জীবন যাপনের শ্রেষ্ঠতম উপায় হলো জীবনের সাথে আনন্দের অনুসন্ধান। আনন্দ আসে জগৎ ও জীবনের প্রতি আন্তরিক ভালবাসা থেকে। ভালোবাসাকে যারা অনেকটা দেবশক্তির মতো মনে করে। তারা বিশ্বাস  করে, ভালোবাসায় জীবন উদ্ভাসিত হয়।

ড. সুব্রত বরণ বড়ুয়া:

দুঃখ-বিবাদ, হতাশা-নিরাশার মাঝেও জীবনের আনন্দ খুঁজে নিতে হয়। জীবন কখনো দুঃখ উপত্যকায় ক্রন্দসী দেবদূতের ন্যায় দিশেহারা ও ¤্রয়িমান হয়। আবার কখনো হয় স্বপ্ন ও আনন্দভরা রংতুলিতে আঁকা রংধনুর ন্যায় রাঙা। জীবনের এই দিকগুলো লেখক সুন্দর লেখনীর মাধ্যমে জীবনীগ্রন্থের মাঝে ফুটিয়ে তোলে। পাঠক সে গ্রন্থ পড়ে জীবনের নির্যাস খুঁজে পায়। কখনও বা নিজের জীবনের সাথে মিলিয়ে নেয়। আবার কখনও নিজের জীবনকে কাক্সিক্ষত জীবনের দিকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করে।

আর স্মৃতিকথা সেতো মানুষের জীবনের এক আশ্চর্য বাস্তবতা। প্রত্যেক মানুষেরই স্মৃতির পাতায় জমে থাকে অনেক না বলা কথা, অনেক ভালো লাগা। অনেক সুখ স্মৃতি, অনেক কষ্ট-বেদনা, দুঃখ যন্ত্রণা সবকিছুই স্থান করে নেয় মানুষের স্মৃতির পাতায়। জীবনের যে বয়সে এসে স্মৃতির পাতা হাতড়ে বের করা যায় এমন অনেক মুহূর্ত যা এক মুহূর্তের জন্য মুখে এক চিলতে হাসির কারণ হয়ে যায়। আবার এমন অনেক মুহূর্ত স্মৃতির পাতায় বন্দী হয়ে যায় যেগুলো নিমিষেই হাসি-খুশি মনটাকে করে দিতে পারে বর্ষার মেঘের মতো মলিন।

অধ্যাপক সুমেধানন্দ মহাথেরো রচিত ’জীবন, জীবনী ও স্মৃতিকথা‘ গ্রন্থটি মূলত একটি প্রবন্ধ সংকলন। এতে তিনি সুন্দর বাস্তবতায় প্রতিটি প্রবন্ধকে জীবনমুখী করে উপস্থাপন করেছেন। এতে মোট ১৯টি রচনা রয়েছে। যা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রবন্ধগুলো মৌলিক না হলেও তথ্যসমৃদ্ধ লিখা। যেখানে বিভিন্ন স্বনামখ্যাত ব্যক্তির জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ দিক ফুটে উঠেছে। এসব প্রবন্ধ একত্রিত করে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করে পাঠকের নিকট নতুনভাবে উপস্থাপনের লক্ষ্যে এ প্রয়াস। 

নিচে কয়েকটি প্রবন্ধের কিছু চুম্বকাংশ উপস্থাপন করছি। “গুরুভন্তের ছায়াতলে” প্রবন্ধে বিদ্যাশিক্ষায় তাঁর গুরুভন্তে বাংলাদেশ বৌদ্ধ ভিক্ষু মহাসভার বর্তমান সভাপতি ভদন্ত সুনন্দ মহাথেরোর প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ লক্ষ্য করা যায় “গুরু ভন্তে মধ্যম আধার মানিক কল্যাণ বিহারে এসে জিনানন্দ মেমোরিয়াল পালি কলেজ প্রতিষ্ঠা করে কলেজের উদ্যোগে পাড়ার (ঐতিহ্যবাহী জনো লোথকের বাড়ি ও সিকদার বাড়ি) ছেলে-মেয়েদের জ্ঞানদান করতেন। সকাল বেলা আমরা সকলে সেখানে পড়তে যেতাম। আমার সমবয়সী আমাদের পাড়ার এমন কেউ নেই যারা সেখানে গিয়ে অক্ষরজ্ঞান অর্জন করেননি। এখানে প্রাত ও সন্ধ্যাকালীন সমবেত বন্দনাও হতো। তখন থেকেই আমি গুরুভন্তের সাথে বেশী ঘনিষ্ট হই। মনে হতো, তিনি অন্যদের চাইতে আমাকে বেশী ¯েœহ করতেন। কারণ, আমি লেখা-পড়ায় অন্যদের চাইতে মোটামোটি ছিলাম। তিনি আমাকে ভালোবাসতেন বলেই আমি সহপাঠী অনেকের ঈর্ষার কারণ হয়েছি। সাথে তিনিও। এতে সাপে বর হলো, তিনি আমার প্রতি আরো মনোযোগী হলেন।” 

এ প্রবন্ধে তিনি আরো লিখেন, গুরু ভন্তে যে আমাকে কী রকম ¯েœহ করেন ও আপন মনে করেন তার প্রমাণ পেলাম যখন আমি বি,এ, পাশ করি তখন। পাশ করার খবরটা যখন গুরুভন্তেকে জানাই তখন তিনি কী যে আনন্দিত হন তা এ ক্ষুদ্র পরিসরে বর্ণনা করা অসম্ভব। তিনি আমায় গঠন করতে সদা তৎপর। 

সম্বুদ্ধানন্দ থেরো’র প্রয়াণোত্তর প্রাসঙ্গিক ভাবনা প্রবন্ধে তিনি দায়ক-দায়িকাদের উদ্দেশ্যে সদ্ধর্ম ও শাসন রক্ষায় যে আহ্বান জানান তা অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে আমি মনে করি। এ প্রবন্ধে তিনি লিখেন, “আপনারা ভিক্ষুসংঘকে আপনাদের থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু ভাবলে চলবে না। ভিক্ষুসংঘ আপনাদের সন্তান। আপনি আপনার সন্তানকে যখন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে গড়তে চান তখন তার পেছনে অনেক অর্থ ব্যয় করেন। ফলশ্রুতিতে আপনাদের সন্তান সেভাবে গড়ে উঠে। ঠিক একই পন্থায় একজন সুশিক্ষিত আদর্শবান ভিক্ষু গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আপনার প্রচেষ্টা থাকতে হবে। দায়কদের প্রতি আবেদন, আপনারা সম্বুদ্ধানন্দ থেরো’র ন্যায় সুশিক্ষিত যুবক বুদ্ধ শাসনে দান করুন। এর দ্বারা আপনাদের জীবনও ধন্য হবে, সমাজ-সদ্ধর্মেরও মহাকল্যাণ সাধিত হবে।

প্রধান শিক্ষক প্রকাশ চন্দ্র বড়–য়া সংবর্ধনা স্মারক ‘প্রকাশ’ স্মারকে প্রকাশিত প্রবন্ধে তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের সকল প্রকার সংকীর্ণতা পরিহার করে প্রকৃত মানুষ হবার আহ্বান জানান। তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশ্য করে লিখেন, ‘তোমরা শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষকের ছাত্র-ছাত্রী হতে পেরে তোমরাও গৌরবান্বিত। এ বিদ্যালয়ের পাঠ সমাপনান্তে তোমরাও যাতে স্ব স্ব ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্বে উপনীত হতে পারো সে অঙ্গীকার গ্রহণ করো। মনে রাখবে, সাম্প্রদায়িকতা, গোত্রে গোত্রে বিভক্তি, সংকীর্ণতা নিজেদেরই ছোট করে। মানুষ হিসেবেই আমাদের পরিচয় হওয়া উচিত।

মহাশূন্যের বেশ উপরে উঠে যখন এদিক-সেদিক তাকাই তখন দেখবো সকল গ্রহের প্রাণীদের (যা এখনো কল্পনা), দেখবো চাঁদের দেশের প্রাণীদের (যা হয়তো বাস্তবে দেখবো) …পৃথিবীর মানুষদেরও দেখবো। সেখান হতে যখন দেখবো তখন বলবো এগুলো মঙ্গল গ্রহের মানুষ। এগুলো চন্দ্রলোকের মানুষ। এগুলো পৃথিবীর মানুষ। তখন কখনো বলবো না এগুলো পৃথিবীর মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান। আমাদের পরিচয় এ হোকÑ আমরা মানুষ। এতেই  আমাদের বৃহৎশক্তি, আর সে বৃহৎশক্তি দিয়েই এ পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তুলবো। এটাই হোক তোমাদের বিদায় ও বরণের অঙ্গীকার।

মহামান্য মহাসংঘনায়ক বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরো’র জন্মশত বার্ষিকীতে তিনি লিখেন, “স্বাধীনতাত্তোরকালে বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরোই বাংলাদেশি বৌদ্ধদের প্রতিনিধিত্বকারী একমাত্র নাম। যিনি মহাথেরো নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন। স্বাধীনতার পর যে সকল সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছেন সকলে মহাথেরো’র বুদ্ধি পরামর্শে বর্হিবিশ্বের সাথে বাংলাদেশের মৈত্রী সেতুবন্ধনে মহাথেরো’র সহযোগিতা নিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রীয় সফরের সফরসঙ্গী হিসাবে তিনি বিদেশ সফর করে বর্হিবিশ্বের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কোন্নয়নে সহায়তা করেন।

বাংলার ইতিহাসে অতীশ দীপঙ্করের পর মহাথেরোই একমাত্র নাম, যিনি দল, মত, সম্প্রদায়, জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সকলের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করেন এবং বিশ্ব দরবারে পরিচিত বৌদ্ধ ভিক্ষু ব্যক্তিত্ব। তাই তাঁকে বাংলার নব অতীশ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here