ইচ্ছা

0
8

সত্যব্রত বড়ুয়া

রাজপুত রাজা ‘রানা প্রতাপ’ প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তিনি মোগল সম্রাট আকবরের সাথে যুদ্ধে জয়ী না হওয়া পর্যন্ত ঘাস খেয়ে থাকবেন। প্রথম দিকে যুদ্ধগুলো তিনি রুটি খেয়ে করলেও শেষের দিকে করেছিলেন ঘাস খেয়েই। যুদ্ধে রানা প্রতাপ জয়ী হতে পারেননি। ঘাস খেয়েই তাঁর মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল। পাকিস্তানের বাচাল পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। প্রয়োজনবোধে তিনি ভারতের সাথে ঘাস খেয়ে হাজার বছর যুদ্ধ করবেন। ‘ঘাস প্রতিজ্ঞা’ আমার না থাকলেও ঘাস খেতে আমার খুব ইচ্ছে করে। বলতে দ্বিধা নেই এরই মধ্যে আমি পরীক্ষামূলকভাবে ঘাস খেয়েছি। ভাজা হিসেবে কলমি শাকের মতো মনে হয়েছে। ঝোল করে খেয়ে দেখেছি মনে হয়েছে পাটশাক (নারিশ শাক) খাচ্ছি।

ঘাস নিয়ে আমার গভীর ভাবনা রয়েছে। আমরা জানি গরু ঘাস খায়। ঘাস খায় বলেই গরু দুধ দিতে পারে। আমাদের দেশের মায়েদের বুকের দুধের স্টক থাকে না। সন্তানের দুধ না পেয়ে কান্নাকাটি করে। দুধের ঘাটতি পূরণ হয়ে যাবে যদি মায়েরা ঘাস খায়। সন্তানের মুখে তখন হাসি ফুটবে। এখন টেলিভিশনের প্রচারণায় বলা প্রয়োজন, ‘মায়েরা ঘাস খান, দুধ বাড়ান।’ আমার খুব ইচ্ছে করে দু’কাঁধে দুটো পাখির মতো ডানা লাগাতে। মনে হয় শীঘ্রই এ ইচ্ছে আমার পূরণ হবে।

ইতোমধ্যে আমি পাতলা তক্তা দিয়ে দু’টো ডানা তৈরি করে ফেলেছি। এগুলো দু’কাঁধে ফিট্ করে দেবো। ডানার নিচে থাকবে ব্যাটারি। ব্যাটারি চালু করে দিলেই ডানা ঝাপটানো শুরু হবে। আমি তখন হেলিকপ্টারের মতো ওপরে ওঠে যাবো। এই ডানা স্বল্প পাল্লার দূরত্বে উড়তে পারবো। এটা শুধু ব্যবহার করবো গাড়ির জ্যাম হতে উদ্ধার পাওয়ার জন্যে। রাস্তার জ্যামে আটকা পড়ার এখন আর আমার কোনো ভয় নেই। ডানা ঝাপটিয়ে উড়াল দিলেই চলবে। আটকা পড়া গাড়ির ওপর দিয়ে উড়ে নিরাপদ জায়গায় নেমে পড়বো। আমার এই নতুন উদ্ভাবিত তক্তা-ডানা’র উড়াল প্রদর্শনী শীঘ্র আমি স্টেডিয়ামের মাঠে প্রদর্শন করবো। মাঠে ৩০-৪০টি গাড়ি লাইন ধরে দাঁড়ানো থাকবে। এ গুলোর ওপর দিয়ে আমি ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে যাবো।

ইচ্ছে করে মাছের মতো জলের নিচে সাঁতার কাটতে। আমি মনে করি এটা আমি করতে পারবো। ঠিক করেছি গালের এক পাশে অপারেশন করে সেখানে মাছের ফুলকো লাগিয়ে নেবো। এই ফুলকোর সাহায্যে আমি নিশ্বাস প্রশ্বাস চালাতে পারবো। জলের নিচের মাছ বুঝতেই পারবে না যে আমি মানুষ। আমাকেও মাছ বলে ভাববে। আমার হাতে থাকবে একটা সিরিঞ্জ। এই সিরিঞ্জে থাকবে মাছকে অচেতন করবার ওষুধ। আমার পাশ দিয়ে সাঁতার কেটে যাওয়া মাছের গায়ে সুঁই ফুটিয়ে দেবো। সহজেই মাছ জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। অচেতন মাছ বগলদাবা করে ডুস করে জলের ওপরে ভেসে উঠবো। বাজার হতে বেশি দামে আর আমাকে মাছ কিনতে হবে না। জলে ডুব দিলেই চলবে। আমি আমার জলের নিচে সাঁতার কেটে মাছ ধরা প্রমাণ করবো লালদীঘিতে ডুব দিয়ে।

ইচ্ছে করে শরৎচন্দ্রের দেব দাসের মতো গরুর গাড়িতে চড়তে। গরুর গাড়ি ওঠে গেছে অনেককাল আগে। গরুর গাড়ি তাই খুঁজে পেলাম না। ঠিক করলাম কারিগর দিয়ে গরুর গাড়ি তৈরি করাবো। খুঁজে পেলাম না গরুর গাড়ি তৈরির কারিগরও। নিজেই তাই মাথা খাটিয়ে গরুর গাড়ি তৈরি করেছি। অসুবিধায় পড়ে গেছি গরু নিয়ে। এখনকার গরুগুলো জীবনে গরুর গাড়ি দেখেনি বলে ভয়ে আমার তৈরি করা গরুর গাড়ি টানতে চাইছে না। অনেক মানুষ বলছে তাদের বেশি টাকা দিলে তারা গরুর বদলে নিজেরা গাড়ি টানবে। কিন্তু-এটা তখন আর গরুর গাড়ি হবে না। হযে যাবে মানুষের গাড়ি। এ গাড়িতে আমি চড়তে চাই না। দেবদাস কখনও এ ধরনের গাড়িতে চড়েনি। গরু আমার জোগাড় করতেই হবে। আমি মনস্থ করেছি এ জন্যে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেবো। বিজ্ঞাপনের শিরোনাম হবে, “গরুর গাড়ির গরু চাই।”

আমার খুব ইচ্ছে করে জানতে দেশের পন্ডিতদের বউদের মধ্যে কতজন পন্ডিত বউ এবং কতজন মূর্খ বউ রয়েছে। জানি না, পন্ডিত স্বামীদের মূর্খ বউরা তাদের পন্ডিত স্বামীদের পান্ডিত্য সম্পর্কে জানে কি না। মূর্খ বউদের ধারণা তাদের পন্ডিত স্বামীদের মাথায় কোনো বুদ্ধি নেই। পন্ডিত বউদের আবার মূর্খ স্বামীও থাকে। এই মূর্খ স্বামীরা নিজেদের মূর্খতা কখনও স্বীকার করতে চায় না।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো রেগে গেলে সবাই মূর্খ হয়ে যায়। ইচ্ছে করে প্রতিদিন মর্নিংওয়াকের সময় পৃথিবী ঘুরে আসতে অমর হওয়ার ইচ্ছেতো রয়েছেই।

পরিচিতি: বিশিষ্ট রম্যসাহিত্যিক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here